রফতানি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক বিবাদ ও শ্লথ প্রবৃদ্ধির মাঝে দেশীয় বাজার চাঙ্গা করতে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দিচ্ছে চীন। এ অবস্থায় দেশটির বাজেটে আর্থিক ঘাটতি ক্রমেই বড় হচ্ছে। সে ঘাটতি পূরণে নেয়া হয়েছে একাধিক পদক্ষেপ। এর অংশ হিসেবে বিদেশী পুঁজিবাজারে চীনে বসবাসকারীদের অর্জিত মুনাফার ওপর কর পরিশোধের আহ্বান আরো জোরালো হয়েছে। এর অন্যথা হলে কঠোর আর্থিক ব্যবস্থা নিচ্ছে বেইজিং। ফলে চীনের মূল ভূখণ্ডের সম্পদশালী বিনিয়োগকারীরা বিদেশে লেনদেনের কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবছেন।
চীনের প্রধান অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হয় সাংহাই, ঝেজিয়াং ও শানডং। এফটির প্রতিবেদন অনুসারে, অঞ্চলগুলোর কর কর্তৃপক্ষ চলতি বছরের শুরু থেকে নিজেদের ওয়েবসাইটে বিনিয়োগকারীদের আয় ও মুনাফার বিস্তারিত তথ্যসহ কর পরিশোধের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে ফোন ও বার্তায় ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি অবহিত করা হচ্ছে। চলতি মাসে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বড় ধরনের প্রচারণা চালিয়ে এ অভিযানকে আরো তীব্র করেছেন চীনা কর্মকর্তারা।
চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক-সমর্থিত ফাইন্যান্সিয়াল নিউজ জানিয়েছে, বিদেশে সরাসরি শেয়ার লেনদেন থেকে পাওয়া আয়ের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নেই। আইন অনুযায়ী কর পরিশোধ প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। এ দায়িত্বে গুরুতর লঙ্ঘন হলে কর কর্তৃপক্ষ তদন্ত করবে এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে।
স্থানীয় বাজারের দুর্বলতা বিবেচনা করে চীনে দেশীয় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে ২০২৭ সাল পর্যন্ত মুনাফা-কর প্রযোজ্য নয়। কিন্তু বিদেশী শেয়ার বা অ্যাকাউন্ট বাবদ আয়ের ওপর কড়া নজরদারি শুরু হয়েছে সম্প্রতি। কারণ দেশীয় শেয়ারবাজার দুর্বল হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা ক্রমবর্ধমান হারে এখন বিদেশী বাজারের দিকে ঝুঁকছেন।
চীনের নিয়ম অনুসারে, যেসব বিনিয়োগকারী বছরে ১৮৩ দিন দেশটির মূল ভূখণ্ড কাটান, তাদের বৈশ্বিক আয়ের ওপর ২০ শতাংশ কর দিতে হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের কর আরোপ প্রচলিত রয়েছে, যার হার সাধারণত ১০-৩০ শতাংশ। তবে সম্ভাব্য কর ফাঁকিদাতাদের কার্যকরভাবে শনাক্তকরণে এতদিন বেইজিংয়ের কাছে যথেষ্ট প্রযুক্তি, জনবল ও বাজেট ছিল না।
সাম্প্রতিক বছগুলোয় জমি বিক্রি থেকে রাজস্ব কমে যাওয়া এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ হওয়ায় চীনে নতুন কর উৎস জরুরি হয়ে পড়েছে। এ চাপ চলতি বছর প্রকট হয়ে উঠেছে। কারণ স্থানীয় সরকারের ঋণ সংকট মোকাবেলা, প্রথমবারের মতো সারা দেশে শিশুভাতা চালু এবং গৃহস্থালি ভোগ বাড়ানোর কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে দেশটি।
২০১৮ সালে ব্যক্তিগত আয়করকেন্দ্রিক একটি মোবাইল অ্যাপ চালু করেছে চীন। এর আগেই ওইসিডি-সমর্থিত বৈশ্বিক করফাঁকি দমনের কাঠামো কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড (সিআরএস) গ্রহণ করেছিল দেশটি। তখন থেকে হংকংসহ ১২০টিরও বেশি সদস্য দেশ ও অঞ্চলের সঙ্গে ব্যাংক, ব্রোকারেজ ও অ্যাসেট ম্যানেজার থেকে বিনিয়োগকারীদের তথ্য পাচ্ছে চীন। ফলে চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে যারা ফুতু সিকিউরিটিজ বা টাইগার ব্রোকার্সের মতো অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহার করে বিদেশী শেয়ার লেনদেন করেন, তাদের শনাক্ত করা সহজ হয়ে গেছে। সাংহাইভিত্তিক আইনজীবী ইউজিন ওয়েং বলেন, ‘মূল ভূখণ্ড কর্তৃপক্ষের জন্য বিদেশী আয়ের উৎস শনাক্ত ও অনুসরণের খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।’
লেনদেনের তথ্য হয়তো মূল ভূখণ্ড কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে গেছে; এমন আশঙ্কা নিয়ে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় ফুতু, টাইগার ও ইন্টারঅ্যাকটিভের মতো ব্রোকার্স প্লাটফর্মে গ্রাহকরা ফোন করেছেন। তবে প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, তারা যেসব দেশে কার্যক্রম চালাচ্ছে, সেই সব দেশের কর আইন যথাযথভাবে পালন করে আসেছে।
গত জুনে সাংহাইভিত্তিক বিনিয়োগকারী রজার হুয়াংকে হংকংয়ে শেয়ার লেনদেন থেকে লভ্যাংশ ও সুদসহ গত তিন বছরে অর্জিত মুনাফার ২০ শতাংশ কর চেয়েছে সাংহাই কর কর্তৃপক্ষ। ২০২৩ সাল পর্যন্ত পূর্ববর্তী দুই বছরের কর ঠিক সময়ে পরিশোধ করেননি এ বিনিয়োগকারী। ফলে এখন তাকে প্রতিদিন অতিরিক্ত জরিমানা গুনতে হচ্ছে। রজার হুয়াং বলেন, ‘এ ধরনের জরিমানা অন্যায়। কারণ আমাকে আগে কোনো নোটিস দেয়া হয়নি।’
সাম্প্রতিক অভিযানের কারণে বিনিয়োগকারীরা তাদের সম্পদ বণ্টন ও কর কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবছেন বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। সিআরএসের আওতায় নেই এমন প্লাটফর্মে তারা অর্থ সরিয়ে নিচ্ছেন। ফুতুর হংকং অ্যাকাউন্ট থেকে সম্পদ সরিয়ে সংস্থার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্লাটফর্মে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন রজার হুয়াং। তিনি বলেন, ‘আমি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিইনি। কারণ কর পরিস্থিতি ভালোভাবে বোঝার জন্য অন্য বিকল্পগুলোর সঙ্গে তুলনা করতে হবে।’
অনেক বিনিয়োগকারী চীনা ব্রোকারেজে থাকা অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে মার্কিন প্লাটফর্মে যেতে চাইছেন। তেমনই একজন বলেন, ‘এটা নিশ্চিত যে আমার জীবদ্দশায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একসঙ্গে কাজ করবে না, তারা তথ্য ভাগাভাগি করবে না। তাই আমি ঝুঁকি নিচ্ছি।’
আইনজীবী ইউজিন ওয়েং সতর্ক করে বলছেন, যতদিন চীনের মূল ভূখণ্ডের শেয়ারবাজার দুর্বল এবং মার্কিন ও হংকং বাজার চাঙ্গা থাকবে, ততদিন পুঁজি পাচার একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবেই থেকে যাবে দেশটিতে।
তিনি আরো যোগ করেন, ‘শেষ পর্যন্ত এটি আস্থার বিষয়। কোনো দেশ যখন কর প্রয়োগে কঠোর হয়, তখন এটি ইঙ্গিত দেয় যে রাষ্ট্রের স্থায়ী ও শক্তিশালী কর ভিত্তি নেই। এ ধারণা বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে দুর্বল করতে পারে।’